Logo

গ্রন্থলোক

 জন্ম ও পারিবারিক পরিচিতি

  • জন্ম ও পৈতৃক নিবাস: সুচিত্রা ভট্টাচার্য ১৯৫০ সালের ১০ জানুয়ারি বিহারের ভাগলপুরে তাঁর মামারবাড়িতে জন্মগ্রহণ করেন। তবে তাঁর পৈতৃক আদি বাড়ি ছিল পশ্চিমবঙ্গের মুর্শিদাবাদ জেলার বহরমপুরে।
  • পিতা-মাতা: তাঁর বাবা ধীশঙ্কর ভট্টাচার্য এবং মা প্রীতিলতা দেবী। বাবা জেসপ কোম্পানির জনসংযোগ আধিকারিক হওয়ার পাশাপাশি মোহনবাগান ক্লাবের একজন নামকরা ফুটবলার ছিলেন।
  • শৈশব: পাঁচ ভাই-বোনের মধ্যে তিনি ছিলেন সবার বড়। ছোটবেলায় তিনি ওড়িশি নাচ শিখতেন এবং মাত্র ৬ বছর বয়সে তপন সিনহার বিখ্যাত ‘কাবুলিওয়ালা’ চলচ্চিত্রে একটি ছোট চরিত্রে অভিনয়ও করেছিলেন। 

 শিক্ষাজীবন ও বিয়ে

  • শিক্ষা: কলকাতার স্কুল গণ্ডি পার করার পর তিনি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক ডিগ্রি লাভ করেন। ছাত্রজীবন থেকেই তাঁর সাহিত্যের প্রতি গভীর অনুরাগ ছিল।
  • বৈবাহিক জীবন: কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করার সময়ই তিনি বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। তাঁর বৈবাহিক জীবনে এক কন্যা সন্তান রয়েছে। সাহিত্যচর্চায় তিনি সবসময় তাঁর স্বামীর কাছ থেকে বিপুল উৎসাহ ও সহযোগিতা পেয়েছিলেন। 

কর্মজীবন ও সাহিত্যজগতে আত্মপ্রকাশ

  • চাকরি জীবন: প্রথম জীবনে তিনি বিভিন্ন জায়গায় চাকরি করার পর স্থায়ীভাবে সরকারি চাকরিতে যোগ দেন। তবে লেখার পেছনে সম্পূর্ণ সময় দেওয়ার জন্য ২০০৪ সালে তিনি স্বেচ্ছায় সরকারি চাকরি থেকে ইস্তফা দেন।
  • লেখালিখির শুরু: গত শতকের সত্তরের দশকের শেষের দিকে তিনি ছোটগল্প দিয়ে সাহিত্যজীবন শুরু করেন। এরপর আশির দশকের মাঝামাঝি সময় থেকে উপন্যাস লেখা শুরু করে পাঠক মহলে বিপুল সাড়া ফেলেন। তিনি তাঁর দীর্ঘ কর্মজীবনে ২৪টিরও বেশি উপন্যাস এবং অসংখ্য ছোটগল্প রচনা করেছেন। 

সাহিত্যিক বৈশিষ্ট্য ও অবদান

  • শহুরে মধ্যবিত্তের দর্পণ: সুচিত্রা ভট্টাচার্যের লেখার মূল শক্তি ছিল কলকাতার সমসাময়িক শহুরে মধ্যবিত্ত জীবনের নিখুঁত চিত্রায়ণ। মানুষের পারস্পরিক সম্পর্কের টানাপোড়েন, আধুনিক জীবনের নৈতিক অবক্ষয় তিনি সহজ ভাষায় তুলে ধরেছেন।
  • নারীবাদী ভাবধারা: সমাজে নারীদের অবদমিত ইচ্ছা, কষ্ট, একাকীত্ব ও লড়াইয়ের গল্প তাঁর লেখনীতে জোরালোভাবে ফুটে উঠত। যদিও তিনি নিজেকে কট্টর 'নারীবাদী' বলতে ভালোবাসতেন না, তবুও তাঁর গল্পে নারীদের আত্মমর্যাদার লড়াই সবসময় প্রাধান্য পেত।
  • মিতিন মাসির স্রষ্টা: বাংলা গোয়েন্দা সাহিত্যে প্রথম সার্থক ও তুখোর নারী গোয়েন্দা চরিত্র ‘মিতিন মাসি’ (প্রজ্ঞা পারমিতা মুখার্জি)-র স্রষ্টা হলেন সুচিত্রা ভট্টাচার্য, যা কিশোর ও বড়দের মধ্যে সমান জনপ্রিয়। 

 উল্লেখযোগ্য সাহিত্যকর্ম ও চলচ্চিত্র রূপান্তর

  • বিখ্যাত উপন্যাস: কাছের মানুষ, দহন, কাচের দেওয়াল, হেমন্তের পাখি, অলীক সুখ, গভীর অসুখ, উড়ো মেঘ, পরবাস ইত্যাদি।
  • চলচ্চিত্র ও মিডিয়া: তাঁর কালজয়ী উপন্যাস ‘দহন’ নিয়ে ১৯৯৭ সালে প্রখ্যাত পরিচালক ঋতুপর্ণ ঘোষ জাতীয় পুরস্কারপ্রাপ্ত চলচ্চিত্র নির্মাণ করেন। এছাড়া তাঁর কাহিনি অবলম্বনে শিবপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় ও নন্দিতা রায় ‘ইচ্ছে’, ‘অলীক সুখ’ এবং ‘রামধনু’-র মতো জনপ্রিয় সিনেমা তৈরি করেছেন। 

পুরস্কার ও সম্মাননা

সাহিত্যক্ষেত্রে অনন্য অবদানের জন্য তিনি বহু পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন, যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য: 

  • নঞ্জাগুডু থিরুমালাম্বা জাতীয় পুরস্কার (১৯৯৬)
  • কথা পুরস্কার (১৯৯৭)
  • তারাশঙ্কর পুরস্কার (২০০০)
  • শরৎ পুরস্কার (২০০২)
  • ভুবনমোহিনী মেডেল (২০০৪) 

জীবনাবসান

২০১৫ সালের ১২ মে মাত্র ৬৫ বছর বয়সে দক্ষিণ কলকাতার ঢাকুরিয়ার নিজস্ব বাসভবনে হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে এই গুণী লেখিকা শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। মৃত্যুর পূর্বে ডান হাত ভেঙে যাওয়ার পরেও তিনি বাঁ হাত দিয়ে ল্যাপটপে টাইপ করে তাঁর লেখার কাজ চালিয়ে গিয়েছিলেন। তাঁর প্রয়াণে সমসাময়িক বাংলা কথাসাহিত্যের একটি সোনালী অধ্যায়ের অবসান ঘটে।